
আপাত দৃষ্টিতে কিছু জিনিস খুব তুচ্ছ মনে হলেও ভেতরে গিয়ে জানা যাবে কত বড় জায়গা দখল করে আছে বিষয়টি- সে না বোঝানো ব্যাপারটা কিঙবা না বুঝতে পারা বিষয়টা মনের অজান্তে বিব্রতকর পরিস্থিতি করে তোলে, করে তোলে মন খারাপের দিস্তা। তেমনি একটি বিষয় শহরের এক কোণে মালেক উকিলের বিল্ডিং এর দোতলার ডান পাশের ফ্ল্যাটটা। দু বেডের, এক ডাইনিং এর ছোট্ট বাসাটা হুট করেই মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আট বছর ধরে একটা বাসায় থেকে ছেড়ে দেয়া মন খারাপের বাতিক হয়েছে! এই বাসাটা শহরের অন্য বাসার মত অতটা গোছানো না, কিঙবা দারোয়ান পাহারা দেয়না, খুব সুন্দর বলেও কোন ব্যাপার নেই। শুধু ২৫ বছরের একটা পুরাতন পাঁচ তলার দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা হয়ে যে ব্যাপারটা সবচেয়ে পীড়া দিচ্ছে- জীবনের আট বছর খুব অল্পতে বিমর্ষ হয়ে গেল।
ছেড়ে আসাটাই সুন্দর মাঝেমাঝে, আঁকড়ে থাকার চেয়ে। গলির তামিম স্টোরের ফিরোজ আঙকেল চলে যাবার তিন বছর হলো নভেম্বরের ১ তারিখ। লোকটা কি অদ্ভুতভাবে নিজেকে অন্যের মনে ঢুকিয়ে দিল। এই গলিতে কাঁচাবাজার বেচতে আসা রবিনের জন্য কষ্ট হবে অনেক। আমরা জীবনে কত উপার্জন করতে পারি? সেসব জেনে কি হয় অন্যের? কিন্তু খুব টানাপোড়নে সংসার চালানো কিশোরগন্জের ভেলপুরি বিক্রেতা সোহাগের সৌদি যাওয়া আটকে যাওয়া আমাকে কষ্ট দিয়েছে অনেক। তারই ভাতিজা হানিফ যখন বলে আবীর ভাই, আজ খাবেননাহ? তখন জোর করে হলে খেয়ে আসতে হয়!
সামনের পাঁচতলা বিল্ডিং এর মালিক জসিম সাহেবকে পূত্রসমেত অবশ্য সেদিন গ্রেফতার করে নিয়ে গেল, ভদ্রলোক কি করেছে সেটা জানতে হলে আজাদি দেখতে হবে ২৪ তারিখের প্রথম পেইজ, একবার দেখা হবেনা ভাবতেই অবাক লাগছে। ভদ্রলোকের সম্ভবত ৩ মাসের জেল হয়ে গেছে। আদিল ভাই দীর্ঘদিন আমার থেকে টাকা নেননি ব্রডব্যান্ডের শুধুমাত্র ভালোবাসার জায়গা থেকে। এই ছোট ছোট বিষয়গুলো জায়গা করে ভেতরে খারাপ লাগার পরিমান বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এসবতো তুচ্ছ, ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে এসব কাউকে টানবেনা, কিঙবা কেউ এই খারাপ লাগার মূল্যবুঝে মন ভালো করতে আসবে এমন মানুষ ইদানিঙ পাইনা, দোষটা অবশ্য আমার। পাশেই ছিল মিতু আপুরা। আংকেল মারা যাবার পর অবশ্য হুট করেই ছেড়েছে বাসা, আর উনাদের থাকা বিল্ডিং এর তৃতীয় তলায় তাকিয়ে আমি বাসায় ফিরতাম! আর ভাবতাম উনারাও পাশে থেকে চলে গেল! আমার অদ্ভুদ শূন্যতা কাজ করতো এলাকায় আমার আপন বলে কেউ রইলনা ভেবে।
মালেক উকিলের বিল্ডিং, গলির পিচ্চিগুলো, মুনমুন কমিউনিটি সেন্টারের প্রতি বৃহস্পতিবার গায়ে হলুদের কনসার্টের আওয়াজে ৯৯৯ এ ফোন দেয়া আমাকে পীড়া দিবে খুব। তুচ্ছ জিনিসের পীড়া যন্ত্রনাদায়ক, কিন্তু মাঝে মাঝে ছেড়ে আসাও সুন্দর! যে বাসায় আমার অনেক সুন্দরের সমাপ্তি ঘটেছে সে বাসা আমি অনেক আগেই ছেড়ে দিতে ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু অদ্ভুদ টান কাজ করেছে। সব শেষ ইচ্ছে হয়েছিল যখন আমার ইউনিভার্সিটির পাঠটুকু চুকে গেল।
সব সুন্দর এর সমাপ্তির জায়গাটাতে আমি অল্প কয়েকটা দিন আছি, ফুরিয়ে আসছে। ছেড়ে যাচ্ছি, সুন্দর বলে।