
আমরা এত সহজে কিছু মেনে নিতে পারি না কেন?
পৃথিবীতে এমন অনেক সত্য আছে, যেগুলো নিয়ে তর্কের চেয়ে নীরবতা বেশি মানায়। তবু মানুষ তর্ক করে। কারণ সত্যের সঙ্গে আমাদের বিবাদ কম, নিজের অহংকারের সঙ্গে বেশি।
আর্জেন্টিনা এই টুর্নামেন্টে ফাইনালে উঠেছে। একজন যোগ্য ফাইনালিস্ট হিসেবেই উঠেছে। এবার তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন। এতে কারও আনন্দ হতে পারে, কারও না-ও হতে পারে; কিন্তু মাঠের ঘাস দর্শকের আবেগ দিয়ে সবুজ থাকে না, খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স দিয়েই থাকে।
মেসির জাতীয় দলের গল্পটা আমার কাছে রিডেম্পশনের গল্প। তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছানো ভাগ্যের বিষয় নয়; সেখানে পৌঁছাতে হয় মাঠে ঘাম ঝরিয়ে, বারবার নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করে। একটি বিশ্বকাপ সে জিতেছে, আরেকটি জয়ের অপেক্ষায় আছে। এই পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা যেভাবে বারবার ফিরে এসেছে, সেই আনন্দটা বুঝবেন, যদি কোনোদিন রেয়াল মাদ্রিদের সমর্থক হয়ে থাকেন। কামব্যাকের সৌন্দর্য আলাদা।
আমার সবচেয়ে প্রিয় ফুটবলার অবশ্যই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এই কথাটা বলতেও আমার দ্বিধা নেই, আর এটাও বলতে কষ্ট নেই যে, সম্পূর্ণতার বিচারে আজ মেসি তার চেয়ে এগিয়ে। রোনালদো জীবনে প্রায় সবই পেয়েছেন, শুধু বিশ্বকাপটি পাননি। এই সত্য মেনে নিতে আমার বুকের ভেতর কোথাও ব্যথা হয় না।
Messi has earned everything through his own merit by playing exceptional football and delivering on the pitch.
ফুটবল আমার জীবনে মন খারাপ ভালো করে। কিন্তু ভালো মন খারাপ করে না। আমার নিজের জীবনের সুখ-দুঃখের নিয়ন্ত্রণ কোনো গোলপোস্টের কাছে জমা রাখিনি।
তাই মেসিকে আরও পরিপূর্ণ ফুটবলার বলতে আমার কোনো সংকোচ নেই। এতে রোনালদোর অর্জন একটুও ছোট হয়ে যায় না। তার জন্য জেগে থাকা অসংখ্য রাত মিথ্যে হয়ে যায় না। তিনি যদি ইতিহাসের দুই নম্বরে থাকেন, কিংবা তিনে, তাতে কি হবে? ঠিক তেমনই, ব্রাজিল যদি আগামী একশো বছরও কোনো ট্রফি না জেতে,তাতে কোন অসুবিধা নেই।
সম্প্রতি মানুষের মন নিয়ে কিছু লেখা পড়ছিলাম। বই নয়, কয়েকটি গবেষণাধর্মী নিবন্ধ। সেখানে এলিজাবেথ কুবলার-রসের একটি বহুল আলোচিত ধারণার কথা আবার মনে পড়ল, DABDA থিওরি। মানুষ যখন কোনো বড় ক্ষতির মুখোমুখি হয়, তখন মন প্রথমে তাকে অস্বীকার করে, যেটাকে বলে Denial। তারপর রাগ (Anger)করে। এরপর এক অদ্ভুত দর-কষাকষি শুরু হয় নিজের সঙ্গেই Bargaining; ‘যদি এমন করতাম, তবে হয়তো এমন হতো না।’ সেই আশাটুকুও ভেঙে গেলে আসে Depression। আর অনেক ঘুরপথ শেষে, কখনো খুব ধীরে, কখনো হঠাৎ করেই এসে পৌঁছায় Acceptance, বাস্তবতার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
মজার বিষয় হলো, কুবলার-রস নিজেই পরে বলেছিলেন, এই ধাপগুলো কোনো প্যারালাল ঘটনা নয়। মানুষ ইচ্ছেমতো এগোয় না; কখনো সামনে যায়, কখনো পেছনে ফেরে, কখনো একই জায়গায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
পৃথিবীর এত সহজ, এত স্বাভাবিক সত্যগুলো আমরা এত কষ্ট করে অস্বীকার করি কেন?
কোথায় আমাদের এত অস্বস্তি?
সব সত্য আমাদের পক্ষে যাবে না। সব গল্প আমাদের নায়ককে দিয়ে শেষ হবে না। তবু পৃথিবী তার নিয়মেই চলবে।
সম্ভবত, পরিণত হওয়া বলতে এটুকুই।