এগারো বছর যাবত আমার বাপজান নাই-
স্রষ্টার কাছে আমি ছায়াতে আশ্রয় চেয়েছিলাম, স্রষ্টা আমার মাথায় রেখে দিলো বাবার হাত।

আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,
কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝঝুম নিরালায়-
কোন য়্যুনিভার্সিটি যদি পছন্দ থাকে আব্বুর, সেটা ছিল সাস্ট। একদিন সাডেন বলে, তুমি কিসে পড়তে চাও? আমিতো এ্যজ ইউজুয়ালি বলছি, জার্নালিজম। কিন্তু ইন্জিনিয়ারিং ছিল আব্বুর প্রথম পছন্দ। উনার সাস্টের পরিবেশ, সাস্ট প্রথম। কিন্তু দিনশেষে ছেলেকে কখনো প্রেশার দেননি। যেটা হতে চাই, শুধু বলতো, তুমি জানো তুমি কতটা যেতে পারো, অল্পতে থেমে যাওয়া যাবেনা।
হঠাৎ ভয়ঙ্কর অসুস্থ হয়ে পড়লাম ২০১২ এর মার্চ থেকে। টাইফয়েড-জন্ডিস কয়েক দফায় একসাথে হলো। পড়াশোনা নাই, জীবনে প্রথম বারের মত টানা স্কুল মিস অনেকদিন। আব্বুকে দেখলাম ডাক্তার দেখানোর পাশাপাশি এতিম খানাগুলোতে ছেলের জন্য দুআ করাচ্ছে, খাবার খাওয়াচ্ছে। কি তার ছুটোছুটি!
শেষ বেলায় আদর করে শ্রীমাণ (সুন্দরতম ছেলে) ডাকতো আমারে। সবার বাবা চুল ছোট করতে বলতো, আমার বাবা কখনো চুল ছোট করাননি, ছেলেকে বড় চুলে সুন্দর লাগবে, সেটাই করিয়েছেন। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রথম কাতারে বসে দেখেছেন, নাটিকা দেখে হেসেছেন, আবার জাম্বুরির ক্যাম্পে প্রচন্ড শীতে সবার মত বেঞ্চে ঘুমাতে দেখে কষ্ট ও পাননি। বলে এসেছেন, সব শিখতে হবে। প্রতি শুক্রবার ডেইলি স্টার নিতে নিতে বাসায় ম্যাগাজিন জমা পড়েছিল দুইশ এর বেশি। পুরো ইংরেজি পত্রিকা এক সপ্তাহে শেষ করতে হবে। বসে বসে শুনতো, পড়তাম। বাসায় ডিকশনারি ছিল অন্তত ১৫+। কিন্তু কখনো পড়াশোনার জন্য প্রেশার ক্রিয়েট করেনি, পরিবেশটাকে এমন ভাবে তৈরি করেছেন, যেখানে দেখব বই, যেখানে নিয়ে যাবে, মিশতে দিবে তাদের থেকে নতুন নতুন শেখব। গ্রামে এমন পরিবেশ ক্রিয়েক করে রাখাটা কিছুটা কঠিনও বটে। কিন্তু অবলীলায় কঠিন কাজটা সহজ করে করেছেন আব্বু।
২০১১ সালে গ্রামীণফোন-প্রথম আলো থেকে তখন উপজেলা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। সবাই তো আব্বুকে ফোন উপজেলা থেকে। সম্ভবত মাহফুজ আঙ্কেল (আব্বুর বন্ধু) ফোন দিয়েছেন, বলে এটা। আমার বাপজান উত্তর দিয়েছিল, ও এইটা! ও তো বলেই গেছে ও চ্যাম্পিয়ান হবে। কথা দিয়েছিল।
এরপর, এক রাতে খাইয়ে দাইয়ে শুইয়ে দিয়ে আমাকে, আমার বাপজান চলে গেছেন, তার আপন গন্তব্যে। যে গন্তব্য থেকে ফেরা হয়না। এরপর আমি কোন কথা রাখতে পারিনাই। সাস্ট দেখে এসেছি, নিজের করতে পারিনি। অনেক কিছু করার কথা করতে পারিনি। কোন কনফিডেন্ট নিজের প্রতি দেখাতে পারিনি। আমি কথা রাখতে পারিনি আব্বু- আমি কতটা যেতে পারি সেইটা নিয়ে সন্দেহ ঢুকে গেছে আমার ভেতর।
আব্বু, এই যে এগারো বছরে আমি যে আপনাকে সবদিন খুঁজেছি এমন না কিন্তু। কিন্তু কিছু হতে চাই, কিছু করতে চাই এই বলা বা করার শান্তিটা নাই, কনফিডেন্টটা নাই। আমি কারো থেকে পাইনাই! কষ্ট, শূন্যতা, একাকীত্ব আমাদের শক্ত করে বলে, আব্বা সেপ্টেম্বরে প্রস্থান করলেন। আমার সেপ্টেম্বর বিষাদে ভরা আমার বাপজানের মৃৃত্যু দিয়ে, কঠিন সত্য কথা, আমার বাপজান মরে গেছে, আমার বাপজান আর নাই, এগারো বছর যাবত আমার বাপজান নাই-